অধ্যাপক ড. মো. ওয়াকিলুর রহমান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: ০৪ মার্চ ২০২৬ , ০৩:১০ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

#

ফ্যামিলি কার্ড: অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও গৃহস্থালি শ্রমের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

ছবি: গণকন্ঠ

অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এমন এক কল্যাণমুখী রাষ্ট্রদর্শন যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়ার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকে। উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সুযোগের সমতা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। জাতিসংঘ ঘোষিত ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডায় “লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড” নীতির মাধ্যমে এই দর্শনকে বৈশ্বিক অঙ্গীকারে রূপ দেওয়া হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য হ্রাস ও লিঙ্গসমতা অর্জনে কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী-পরিত্যক্তা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিডি-ভিজিএফ, মাতৃত্বকালীন ভাতা-এসব উদ্যোগ লক্ষাধিক পরিবারকে ন্যূনতম আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা দিয়েছে। ২০১৫ সালে প্রণীত জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল সামাজিক সুরক্ষাকে জীবনচক্রভিত্তিক ও সমন্বিত কাঠামোয় রূপ দেওয়ার রূপরেখা প্রদান করে, যেখানে তথ্যভিত্তিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়।


অর্ন্তবর্তীকালিন সরকার ‘সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের অভিযাত্রা’ নামে সামিজিক নিরাপত্তা বেষ্ঠনীকে ঢেলে সাজানোর অভিপ্রায়ে,  ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য ১,১৬,৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪.৭৮ শতাংশ এবং দেশের জিডিপির ১.৮৭ শতাংশ। বর্তমানে ২৬টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৯৫টি (পূর্বে ১৪০টি) কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাস্তবায়নের সুবিধার্থে এসব কর্মসূচিকে  ১১টি জীবনচক্রভিত্তিক, ৭টি কার্যভিত্তিক এবং ৩৯টি দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচিতে বিভক্ত করা হয়েছে। 


তবে মাঠপর্যায়ের গবেষণায় কর্মসূচি বাস্তবায়নে একাধিক প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত হয়েছে। উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা অন্যতম বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত দরিদ্র বাদ পড়েছে আবার অযোগ্য ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তথ্যের ঘাটতি, স্বচ্ছতার অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব এসব ত্রুটিকে তীব্র করেছে। কর্মসূচিগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং বিচ্ছিন্ন ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনা সামাজিক সুরক্ষার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশ্ব ব্যাংকের বিশ্লেষণেও দেখা যায়, সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা রেজিস্ট্রি না থাকলে লক্ষ্যভ্রষ্টতা ও অপচয় বৃদ্ধি পায়। 


এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের আলোকে অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি হিসেবে “ফ্যামিলি কার্ড” বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কর্মসূচিটি দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ইতমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে পরিবারভিত্তিক একটি সমন্বিত কাঠামোয় রূপান্তর করা। মূলত ব্যক্তি নয়, পরিবারকে একক হিসেবে চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত ও হালনাগাদকৃত ডিজিটাল ডেটাবেজ গড়ে তোলা গেলে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। এর ফলে উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া হবে অধিক স্বচ্ছ ও নির্ভুল একই পরিবারের একাধিকবার সুবিধা প্রাপ্তির পুনরাবৃত্তি কমবে এবং প্রশাসনিক ব্যয় সাশ্রয় হবে। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নিশ্চিত করতে হলে তা পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মাধ্যমে যাচাই করে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করতে হবে।


উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বা পাইলটিং একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর কৌশল, যা নীতির বাস্তবতা যাচাই এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চীন এই ক্ষেত্রে একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। চীনের “ইন্টারন্যাশনাল প্রোভার্টি রিডাকশন সেন্টার ইন চায়না” তে স্বল্প সময় কাজের অভিজ্ঞতায় আমি দেখিছে যে তাদের উন্নয়ন কৌশলের মূলমন্ত্র হলো - আগে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ, পরে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ। 


এই নীতির আলোকে দারিদ্র্য বিমোচন, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রথমে নির্দিষ্ট প্রদেশ বা অঞ্চলে সীমিত পরিসরে চালু করা হয়। এরপর মাঠপর্যায়ের ফলাফল বিশ্লেষণ, ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কর্মসূচিকে পরিমার্জিত করা হয়। সবশেষে সফলতার ভিত্তিতে তা জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করা হয়। এ ধরনের পদ্ধতি প্রশাসনিক ঝুঁকি কমায়, অপচয় হ্রাস করে এবং বাস্তবভিত্তিক ও তথ্যসমর্থিত নীতি প্রণয়নে সহায়তা করে। বাংলাদেশের “ফ্যামিলি কার্ড” উদ্যোগও যদি নির্বাচিত এলাকায় পাইলট আকারে শুরু করে অভিজ্ঞতার আলোকে সম্প্রসারিত হয় তবে তা অধিক টেকসই ও ফলপ্রসূ হতে পারে। এই কর্মসূচির একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো পরিবারের একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামে কার্ড ইস্যুর পরিকল্পনা। 


পরিবার একটি প্রাথমিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেখানে নারীর অবদান অনন্য কিন্তু দীর্ঘদিন অবমূল্যায়িত। বাংলাদেশের গৃহিণীরা অদৃশ্য অর্থনৈতিক শ্রমের মাধ্যমে পরিবার পরিচালনা ও মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কিন্তু জাতীয় আয় হিসাব ব্যবস্থায় সেই শ্রমের স্বীকৃতি সীমিত। নারীর নামে কার্ড ইস্যু হলে তা আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। ইউএন উইমেনের গবেষণা বলছে, নারীকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিবার ও শিশুর কল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।


তবে সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগের সামনে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে-সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই অর্থায়ন। শক্তিশালী মনিটরিং ও মূল্যায়ন কাঠামো, নিয়মিত ডেটা আপডেট এবং সামাজিক নিরীক্ষা প্রক্রিয়া চালু করা গেলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা ও স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি, যাতে কর্মসূচিটি কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগ না হয়ে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়।


সর্বোপরি, “ফ্যামিলি কার্ড” সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে একটি সমন্বিত, তথ্যনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোয় রূপান্তর করতে পারে। এতে দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং গৃহস্থালি শ্রমের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি একসঙ্গে অর্জনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন তখন আর কেবল নীতিগত অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা প্রতিটি পরিবারের বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হবে এবং কল্যাণময় রাষ্ট্র নির্মাণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে।


~ ড. মো. ওয়াকিলুর রহমান

অধ্যাপক, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ