নারায়ণ চন্দ্র রায়, দিনাজপুর প্রতিনিধি।
প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৫:২৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ছবি; গণকন্ঠ
নামের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই—মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। নাম শুনলে মনে হয়, এখানে মা ও শিশুর জন্য থাকবে নিরাপদ চিকিৎসা, আস্থা আর ভরসা। কিন্তু বাস্তবে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আলোকঝাড়ী ইউনিয়নে দাঁড়িয়ে থাকা ১০ শয্যাবিশিষ্ট এই কেন্দ্র যেন নীরব এক স্মৃতিস্তম্ভ—ভবন আছে, বেড আছে, রোগী আছে; নেই শুধু চিকিৎসা।
প্রায় এক যুগ আগে বড় স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হয় কেন্দ্রটির। দিনাজপুর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ২০১৪ সালের ১০ মে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনের ফিতা কেটেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। উদ্বোধনের দিন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা ছিল—গরিব মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে চিকিৎসাসেবা। কিন্তু বছর গড়ালেও চিকিৎসক আর এলেন না।
দীর্ঘ সাত বছর ধরে এই কেন্দ্রে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সিজারিয়ান তো দূরের কথা, নিয়মিত একজন এমবিবিএস চিকিৎসকও নেই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শুধু স্বাভাবিক প্রসব করাতে একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন পাহারাদার ও একজন ঝাড়ুদার—এই নিয়েই চলছে ‘হাসপাতাল’।
উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার সীমা নাথ বলেন, “জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। তারপরও যতটুকু লোকবল আছে, তা দিয়ে চেষ্টা করছি। এখানে মাসে ৮–১০ জনের স্বাভাবিক প্রসব হয়।”
ভবনের ভেতরের চিত্রও হতাশাজনক। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ফাটল, কোথাও রড বেরিয়ে এসেছে। নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তারের কারণে মাঝেমধ্যে শর্টসার্কিটের আশঙ্কা তৈরি হয়। চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন তো দূরের কথা, যা আছে তাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক আরফান সিরাজ বলেন, “ভবনের তার খুবই নিম্নমানের। বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে নিজেরাই কিছু অংশ মেরামত করেছি।”
সেবা নিতে আসা বেলি আক্তার বলেন, “এখানে এসে কোনো লাভ নাই। শুধু চেকআপ ছাড়া আর কিছুই হয় না। সেটাও মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যায়।”
আরেক ভুক্তভোগী শিউলি কোলে অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে বলেন, “মেয়ের অনেক জ্বর। এখানে ডাক্তার নাই, তাই বাইরে নিয়ে যাচ্ছি। নাম আছে মা ও শিশু, কাজে তো কিছুই আসে না।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অতিরিক্ত কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, “আমরা বারবার চিকিৎসকের চাহিদা পাঠিয়েছি। আশা করছি দ্রুত নিয়োগ হবে। এই সংকট শুধু খানসামায় নয়, সারা দেশেই রয়েছে।”
জানতে চাওয়া হয়েছিল দিনাজপুর জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য। তবে একাধিকবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে দিনাজপুর-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামান মিয়া এক সভায় বলেন, হাসপাতালের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ঢাকায় গিয়ে মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত চিকিৎসক আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ছয় মাসের মধ্যেই ডাক্তার নিয়োগের আশ্বাস দেন তিনি।
সরকার পরিবর্তন হয়েছে, প্রশাসনিক রদবদল হয়েছে—কিন্তু আলোকঝাড়ীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের চিত্র বদলায়নি। এখন এলাকাবাসী তাকিয়ে আছে নতুন সরকারের দিকে—এই আশায়, হয়তো এবার অন্তত একজন চিকিৎসক আসবেন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছাবে, আর প্রাণ ফিরে পাবে নামেই নয়, কাজে-ও ‘মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র’।
ততদিন পর্যন্ত আলোকঝাড়ীর এই হাসপাতাল দাঁড়িয়ে থাকবে—স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে, এক নিঃশব্দ অপেক্ষায়।