প্রকাশিত: ০৩ মার্চ ২০২৬ , ০১:৫৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী একসময়ের বর্ষায় উত্তাল খরস্রোতা করাঙ্গী নদী এখন পানি শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। পানি না থাকায় বিলুপ্ত হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। নদীর তলদেশ শুকিয়ে যাওয়ায় নাব্যতা হারিয়েছে করাঙ্গী। দখল-দূষণ ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নদীর বুকে পলি জমে উঁচু হয়ে গেছে। নদীর দুই পার দখল করে বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ করা হচ্ছে। দখল ও দূষণের কারণে দুই পাড় চেপে গেছে। ফলে খরস্রোতা করাঙ্গী নদী আজ শুধুই স্মৃতি—পরিণত হয়েছে মরা খালে।
এদিকে প্রভাবশালীদের হাতে চলছে নদী দখলের মহোৎসব। অনেকেই নদীর ভেতরে গড়ে তুলেছেন দোকান, ঘরবাড়ি। পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও কোম্পানির বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে এই নদীর তীরে। এতে নদীর পানি শুধু দূষিতই হচ্ছে না, বরং বাতাসেও ছড়াচ্ছে বিষাক্ত বাষ্প। কালের সাক্ষী হয়ে এখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বয়ে চলছে এক কালের খরস্রোতা করাঙ্গী নদী। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখল, দূষণ, নদী ভরাটসহ নানাবিধ অত্যাচার চলছে এই নদীর ওপর।
করাঙ্গী নদী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম আন্তঃসীমান্ত খোয়াই নদীর একটি শাখা নদী। এটি ভারতের আসামের একটি নালা থেকে উৎপত্তি হয়ে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট থানার সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে বাহুবল উপজেলা অতিক্রম করে বিভিন্ন হাওরে গিয়ে নিঃশেষ হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য ৫৮ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৩৫ মিটার। একসময় কানায় কানায় পানিতে পূর্ণ থাকত নদীটি। খরস্রোতা এই নদী শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পর্যন্ত পানিতে পূর্ণ থাকলেও বাকি ৯ মাস মরা খালের রূপ নেয়।
বর্ষা শেষে পানি শুকাতে শুরু করলে স্থানীয়রা নদীর দুই পাশের ঢাল দখল করে চাষাবাদ করেন। এতে কৃষিজমিসহ দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা পূরণে তিন ইউনিয়নের মানুষ পানি সংকটে ভুগছেন। হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। এক সময় নদীর তীরবর্তী এলাকার কৃষকরা বোরো মৌসুমে চাষাবাদের জন্য করাঙ্গী নদীর পানি ব্যবহার করতেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন এলাকার কৃষকরা। এখন কোনো কোনো স্থানে নদীর মাঝখানে চর জেগে উঠেছে এবং তার দুই পাশ দিয়ে সরু নালার মতো পানি প্রবাহিত হয়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরসমান পানি থাকে; তখন মানুষ হেঁটেই নদী পার হন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেলেদের মৎস্য আহরণসহ এলাকার কৃষিকাজের পানির জন্য এই নদীর ওপরই নির্ভরশীল ছিল উপজেলার হাজারো মানুষ। সম্প্রতি এক সময়ের খরস্রোতা করাঙ্গী নদী আজ প্রায় পানিশূন্য। বিস্তীর্ণ নদীর বুক যেন ফসলের মাঠ। নদীর বুকে চর পড়ছে, চিকচিক করছে ধু-ধু বালু। বাহুবল উপজেলার অধিকাংশ নদ-নদী ও খাল-বিল আজ পানিশূন্য।
পানি হচ্ছে নদীর প্রাণ। সেই পানির জন্য হাহাকার করছে করাঙ্গী নদী। অথচ কেউ শুনছে না নদীর এই কান্না। দখল ও দূষণে মরছে নদী। দীর্ঘদিন করাঙ্গী নদী খনন না করায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানির সঙ্গে আসা বালি-পলি জমে নদীর নাব্যতা হারিয়েছে।
করাঙ্গী নদীর তলদেশে এখন ধান চাষ হচ্ছে। অপরদিকে চুনারুঘাট উপজেলার রানীগাঁও এলাকায় করাঙ্গী নদীতে বাঁধ দিয়ে এবং উজানে তৈরি কয়েকটি ড্যাম ও ব্যারাজ পানির গতি পরিবর্তন করায় বাহুবল অংশে নদীটি পানিশূন্য হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত পলি জমে নদীটি ভরাট হয়ে গেছে। নানা ধরনের শিল্পবর্জ্যের দূষণে নদীর প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে। পাশাপাশি নদীর পাড় দখল করে কিংবা নদীর বুকেই চলছে অবৈধ নির্মাণ।
এক সময়ের অন্যতম নদী হিসেবে পরিচিত করাঙ্গী এখন বিশাল বালুচরের নিচে চাপা পড়ে হাহাকার করছে। দেখলে মনে হয় নদী নয়, যেন ক্ষীণধারা। একসময়ের চঞ্চল, দূরন্ত যৌবনা করাঙ্গী এখন মরা নদীর নাম।
সচেতন মহল বলছেন, একসময় বাঁধ দিয়ে স্রোত আটকানোর কারণে পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে নদী ভরাট হয়ে যায়। ফলে পরিবেশ দূষণ বাড়ে এবং দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে। নদীটি পুনঃখনন করা হলে পানির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং দেশীয় মাছের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।
পরিবেশবিদদের অভিযোগ, খরস্রোতা এ নদীর যৌবন ফিরিয়ে আনতে সরকারি কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই; বরং কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে নদীকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলছে। উজানে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে ভাটি অঞ্চলে পানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে নদীতীরবর্তী মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও গৃহপালিত পশু পালনেও বিঘ্ন ঘটছে।
রাজাপুর গ্রামের কৃষক রাসেল মিয়া বলেন, বাহুবল সদর, ভাদেশ্বর ও সাতকাপন ইউনিয়নের কয়েক হাজার কৃষক আবহমানকাল থেকে করাঙ্গী নদীর পানি দিয়ে চাষাবাদ করতেন। হাঁসের খামার ও গরু-ছাগল পালনেও এ নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন তারা।
স্থানীয় কৃষকরা বলেন, একটা সময় ছিল যখন করাঙ্গী নদী দিয়ে বড় বড় নৌকা চলত। কিন্তু এখন সে দৃশ্য আর দেখা যায় না। বড় নৌকার কথা দূরে থাক, নদীটি এখন মরা খালে পরিণত হচ্ছে।
বর্তমানে নদীতে পানি না থাকায় উপজেলার হাজারো বোরো ধানের জমি পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অব্যাহত দখল ও দূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে করাঙ্গী নদী অচিরেই হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
শিক্ষানবিশ আইনজীবী মিজানুর রহমান মিজান বলেন, নদীর ঢালে চাষাবাদ বন্ধ করে পুনঃখনন করলে নাব্যতা ফিরে আসবে, তখন দেশীয় মাছগুলো আবার বিচরণ করতে পারবে।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহবুবুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে গণকন্ঠের হবিগঞ্জ সদর প্রতিনিধি খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে তিনটি প্রশ্ন পাঠান—
১. করাঙ্গী নদীর মূল সীমানা (আরএস/এসএ রেকর্ড অনুযায়ী) চিহ্নিতকরণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা?
২. দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলা বা জরিমানা করা হয়েছে কিনা?
৩. নদী দখলমুক্ত করতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কোনো রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে কিনা?
তবে প্রতিবেদন প্রকাশের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সামিউন আসিফের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে—“হ্যাঁ।” পুনরুদ্ধারে কোনো পরিকল্পনা আছে কি না—জবাবে বলেন, “না।” পানি উন্নয়ন বোর্ড বা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত প্রকল্প নেওয়া হয়েছে কি না—তিনি বলেন, “এটি মৎস্য কর্মকর্তার দায়িত্ব নয়।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, নদী খনন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্ব নয়। তবে বিএডিসি কিছু খাল খননের উদ্যোগ নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কৃষি বিভাগ এডব্লিউডি পদ্ধতিতে ধান চাষ, তাপসহিষ্ণু গমের জাত, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার, নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর সেচ ও মালচিং পদ্ধতি প্রচলনের চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা খিলবামৈই সেচ প্রকল্প শিগগির চালু হতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিটন চন্দ্র দের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০ কিলোমিটার করাঙ্গী নদী খনন প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের ৩১ মে। ২০ কিলোমিটার এলাকা খনন করা হলেও নানা অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কাজের শুরুতেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'উন্নয়ন ইন্টারন্যাশনালে'র বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কোটি টাকার প্রকল্প শেষ হলেও নদীর বড় একটি অংশ এখনো পানিশূন্য। ফলস্বরূপ এক সময়ের খরস্রোতা করাঙ্গী নদী আজ মরা খালে পরিণত হয়েছে।