প্রকাশিত: ০১ মার্চ ২০২৬ , ১২:২৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব
এখন আর কেবল ‘শীতল যুদ্ধ’ বা
আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি বৈশ্বিক
সংঘাতে রূপ নিচ্ছে, যেখানে পরাশক্তিগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ
এবং অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন
মার্কিন প্রশাসনের ‘ম্যাক্সিমালিস্ট’ বা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অনড় অবস্থান
বিশ্ব ব্যবস্থাকে নতুন এক মেরূকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক
সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উদ্ভূত
পরিস্থিতিতে কূটনীতির পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে এবং সামরিক শক্তিই এখন
ভূরাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সংঘাত যে শুধু
বিশ্বের মানচিত্রের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে তা নয়, বরং বিশ্ব
অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মানবিক স্থিতিশীলতাকে
এক দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখেও ঠেলে দিচ্ছে। প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য—সবখানেই এখন বেজে উঠছে যুদ্ধের দামামা, যা
বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ‘অপারেশন
রোরিং লায়ন’ ও ইরানের পাল্টা আঘাত: গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও
ইসরায়েল একযোগে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’ নামক একটি বিশাল সামরিক
অভিযান শুরু করেছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ অভিযানকে
ইসরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ‘অপরিহার্য’ বলে বর্ণনা করেছেন।
পাল্টা ব্যবস্থা
হিসেবে ইরানও বসে থাকেনি। আইডিএফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের
মাটি থেকে ইসরায়েল অভিমুখে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। শুধু
তা-ই নয়, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও ইরান
সরাসরি হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) অস্ত্র সমর্পণের আলটিমেটাম দিয়েছেন,
নতুবা ‘নিশ্চিত মৃত্যু’র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। পলিটিকোর এক বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ
করেছেন, এবারের সংঘাত আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণঘাতী ও
অননুমেয় হতে পারে, কারণ ট্রাম্প এবার আর কেবল আকাশপথের
হামলায় সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছেন না, বরং ইরান সরকারের পতনের
ডাক দিয়েছেন।
পাকিস্তান-আফগানিস্তান
কি দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ফ্রন্ট: পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনার মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ায়
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ‘পুরোদস্তুর যুদ্ধ’ শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, পাকিস্তান শুক্রবার কাবুল ও কান্দাহারসহ আফগানিস্তানের প্রধান
শহরগুলোতে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়
ইসলামাবাদ, নওশেরা ও অ্যাবটাবাদে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র
হামলার দাবি করেছে।
পাকিস্তানের
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ এ পরিস্থিতিকে ‘সরাসরি যুদ্ধ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ এবং উগ্রবাদ দমনের
অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া এ দ্বন্দ্ব এখন বড় আকারের আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিয়েছে। এদিকে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে এ সংঘাতে
মধ্যস্থতা বা হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের আন্ডার
সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকার পাকিস্তানের ‘আত্মরক্ষার
অধিকারের’ প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, যা এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন
যুদ্ধ চলছেই: দক্ষিণ এশিয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে যখন নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজছে, তখন
ইউরোপের মাটিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চার বছর পূর্ণ করে পঞ্চম বছরে পদার্পণ
করেছে। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনীয়
বাহিনী দক্ষিণ দিকে প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে রাশিয়া সম্প্রতি পূর্ব ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব ‘পোকরোভস্ক’ দখল করে নিয়েছে, যা দুই বছরব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফল।
বিশ্লেষকদের মতে, এ
যুদ্ধ এখন একটি ‘প্রযুক্তিগত যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘ফ্ল্যামিংগো’ মিসাইল দিয়ে রাশিয়ার ১ হাজার ২০০
কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত মিসাইল কারখানায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়া তাদের সামরিক উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে সরাসরি ফ্যাক্টরি থেকে
উৎপাদিত মিসাইল দিয়ে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত
রেখেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন পর্যন্ত ইউক্রেনকে ১৯৫ বিলিয়ন ইউরো সাহায্য
পাঠিয়েছে এবং আরও অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা
এ যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গাজার মানবিক বিপর্যয়
ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি: গাজার পরিস্থিতি এখনো থমথমে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে,
গত অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি
সত্ত্বেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা থামেনি। গত বৃহস্পতিবারও গাজায় ইসরায়েলি হামলায়
আটজন নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭২
হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই
নারী ও শিশু। এ ছাড়া গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে
ছয় শতাধিক ফিলিস্তিনি।
চুক্তির দ্বিতীয়
পর্যায় অনুযায়ী ইসরায়েলের সৈন্য প্রত্যাহার করার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র
ভিন্ন। উভয়পক্ষই একে অন্যকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করছে। গাজার বিশাল এলাকা
এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে মানবিক সংকট চরমে পৌঁছেছে।
কোন দিকে যাচ্ছে
বিশ্ব: সার্বিক এ যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্ব
এখন এক বহুমুখী সংকটের আবর্তে। বলা যায়, আন্তর্জাতিক
শাসনব্যবস্থা বা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ এখন ভেঙে পড়ার মুখে। দ্য গার্ডিয়ানের এক সম্পাদকীয়তে বিশ্বের বিভিন্ন
দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। তাদের মতে,
কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই এ হামলাগুলো চালানো হচ্ছে,
যা শুধু বিশৃঙ্খলা ও মানবিক বিপর্যয়ই ডেকে আনবে। সম্পাদকীয়তে
সতর্ক করে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের এ আক্রমণাত্মক
নীতি এবং মিত্রদের পরামর্শ উপেক্ষা করার প্রবণতা বিশ্বকে অরাজকতার দিকে নিয়ে
যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়লে তা পুরো অঞ্চলে গৃহযুদ্ধ এবং
তেলের বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
পলিটিকো ও ইউরেশিয়া
গ্রুপের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে এখন আর কেউ পিছু হটতে রাজি নয়। একে
অপরের ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার এ
প্রতিযোগিতায় সাধারণ বেসামরিক মানুষের জীবন আজ চরম ঝুঁকির মুখে। জর্ডান ও কাতারের
মতো দেশগুলো থেকে বিদেশি নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ এবং আকাশসীমা বন্ধ করে
দেওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, বিশ্ব এখন একটি পূর্ণাঙ্গ
বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব
আজ এক ভয়ংকর উত্তেজনার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ব্যর্থতা এবং
সামরিক শক্তির আস্ফালন সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক
সংস্থাগুলো এবং বিশ্বনেতারা যদি এখনই কার্যকর কোনো সমঝোতায় না পৌঁছাতে পারেন,
তবে এ যুদ্ধের দামামা হয়তো অচিরেই এক বৈশ্বিক মহাপ্রলয়ে রূপ
নেবে। বিশ্ব এখন শান্তির পথে নয়, বরং এক অনিশ্চিত ধ্বংসের
দিকেই ধাবিত হচ্ছে।