প্রকাশিত: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৪:৩৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে সংবাদ সম্মেলনে ‘স্বৈরাচার’ সমালোচনা করায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তিন কর্মকর্তাকে শোকজের পাশাপাশি শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। তাদের ১০ দিনের মধ্যে শোকজের জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে একটি অফিস আদেশ জারি করে।
শোকজ ও বদলির আওতায় আসা তিন কর্মকর্তা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ। তাদের মধ্যে নওশাদ মোস্তফাকে বরিশালে, একেএম মাসুম বিল্লাহকে রংপুরে এবং গোলাম মোস্তফা শ্রাবণকে রাজশাহী বিভাগের বগুড়ায় বদলি করা হয়েছে।
গভর্নরকে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলন করার এখতিয়ার রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “যেহেতু শোকজ করা হয়েছে, তাই এ মুহূর্তে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। জবাব পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে এই তিন কর্মকর্তা, জিয়া পরিষদসহ সকল দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। শুধু মাত্র তাদেরকে শোকজ করায় গভর্নরের রিরুদ্ধে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আকস্মিকভাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ওই তিন কর্মকর্তা গভর্নরের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন এবং তাকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দেন। সেখানে দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে এক্সিম ব্যাংক ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ এবং ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন এবং কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীল, হলুদ ও সবুজ-এই তিন দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সর্বদলীয় ঐক্য গঠন করা হয়েছে। এর সমন্বয়ক করা হয়েছে নির্বাহী পরিচালক ও বিএফআইইউ-এর ডেপুটি হেড মফিজুর রহমান খান চৌধুরীকে। তবে ১৬ ফেব্রুয়ারির সংবাদ সম্মেলনে তাকে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের সংবাদ সম্মেলন, সভা বা বক্তব্য দেওয়ার আগে গভর্নরের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গভর্নর বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা অভ্যন্তরীণ ফোরামে আলোচনার সুযোগ রয়েছে; এভাবে প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলনের বিধান নেই। অথচ নিয়মবহির্ভূতভাবে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলন থেকে একই দিন অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ সভার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, দ্রুততার সঙ্গে বিকাশ-কে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে কর্মকর্তাদের সরবরাহ করা নথি অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স মূল্যায়নসহ মোট আটটি এজেন্ডা নিয়ে ওই দিন পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ বলেন, ব্যাংক খাত নিয়ে গভর্নরের ‘খেয়ালিপূর্ণ’ বক্তব্য বন্ধ করতে হবে এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক রেজল্যুশন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, অপেক্ষাকৃত কম দুর্বল এক্সিম ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংককে পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ।
কাউন্সিলের সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ বলেন, “আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন চাই। তবে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠানের জন্য, ব্যক্তির জন্য নয়। স্বায়ত্তশাসন মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান একনায়ক বা স্বৈরাচার হয়ে উঠবেন।”
তিনি আরও বলেন, “বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হলেও আমরা চুপ ছিলাম-এমন অভিযোগ উঠছে। আগে না বললে প্রশ্ন উঠেছে, এখন বললেও প্রশ্ন উঠছে। আমরা এই দায় আর বহন করতে চাই না।”
নওশাদ মোস্তফা বলেন, “৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়তো আমরা এতটা খোলামেলাভাবে কথা বলতাম না।”
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শোকজের জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।