গণকন্ঠ প্রতিবেদক

বিপুল হোসেন সৈকত , রাজশাহী প্রতিনিধি।

প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৫:৫৮ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

#

মিষ্টি আমের রাজধানী খ্যাত বাঘায় গাছে গাছে উঁকি দিচ্ছে মুকুল

ছবি; গণকন্ঠ

মিষ্টি আমের রাজধানী খ্যাত রাজশাহীর জেলার ঐতিহ্যবাহী বাঘা উপজেলা, উপজেলা জুড়ে এখন গাছে গাছে দেখা যাচ্ছে  আম মুকুলের মেলা। 

দেশের একটি ঐতিহাসিক উপজেলা হলো বাঘা, বাঘা ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে বাঘা শাহী মসজিদ যা আমরা বাংলাদেশ পুরোনো ৫০ টাকার নোটে দেখতে পাই। বাঘা উপজেলার আরো একটি সুনাম রয়েছে যেটি হলো মিস্টি আম, বাঘা উপজেলার আমের কদর দেশ ছেড়ে পৌঁছে গেছে ইতালি, ফ্রান্স, হংকং সহ দেশের বাহিরের অনেক উন্নত দেশে।  


এই জেলাকে আমের জন্য বিখ্যাত বলা হলেও মূলত আম প্রধান অঞ্চল হিসাবে খ্যাত জেলার বাঘা-চারঘাট ও পুঠিয়া উপজেলা। এ অঞ্চলের কৃষকরা জানান, গত বছর অধিকাংশ বাগানে ভালো আম হয়নি। ফলে এ বছর সকল বাগানে পরিপূর্ণ মুকুল বের হচ্ছে। আম চাষীদের মতে , এখন পর্যন্ত আবহাওয়ার যে অবস্থা তাতে বিগত বছরের তুলনায় এবার আমের মুকুল ভাল হবে।


১৫২৩-১২২৪ খিস্টাব্দে (হিজরি-৯৩০) হোসেন শাহ্ এর পূত্র নুসরাত শাহ শাহী মসজিদ নির্মান করেন। এই শাহী মসজিদে চুন-সুড়কি দিয়ে গাথা পোড়া ইটের শিলা-লিপিতেও আমের টেরাকোটা অংকিত আছে। যা থেকে প্রমানিত হয়, বাঘার আমের সুখ্যাতি প্রাচীন আমল থেকে স্বীকৃত। তাঁরা আরো বলেন, এই মুহুর্তে গাছে গাছে ফুটছে আমের মুকুল। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে এই মুকুলের পাগল করা ঘ্রাণ। বাতাসে মিশে সৃষ্টি করছে মৌ-মৌ গন্ধ। যে গন্ধ মানুষের মনকে বিমোহিত করছে। পাশাপাশি মধুমাসের আগমনী বার্তাও জানান দিচ্ছে আম্র কাননের।


উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী জেলার ৯ টি উপজেলার মধ্যে ৮ টিতে যে পরিমান আম বাগান রয়েছে। তার সম-পরিমান বাগান রয়েছে কেবল বাঘা উপজেলায়। এখানকার প্রধান অর্থকারী ফসল আম। শুধু তাই নয়, বাঘার আমের খ্যাতি সারা দেশ জুড়ে। ঢাকার বাজারে অন্য যে কোন জেলা-উপজেলার চেয়ে বাঘার আমের দাম সব সময় বেশি। গত ৭-৮ বছর থেকে এখানকার আম রপ্তানী হচ্ছে- সুইজারল্যান্ড,হংকং, লেদার ল্যান্ড, ইটালি ও ফ্রান্স-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। আমকে ঘিরে প্রতি মৌসুমে বাঘা এলাকায় অন্তত ২৫টি ছোট-বড় আমের বাজার (হাট) বসে। এর মধ্যে বড় বাজার বসে বাঘা সদর, মনিগ্রাম, বিনোদপুর, বাউসা,আড়ানী , পাকুড়িয়া ও পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বরে। সেই হাটে পাশ্ববর্তী চারঘাট থেকেও আম যায়।


স্থানীয় লোকজন জানান, এ বছর আম পাকার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত যদি আবহাওয়া অনুকুল থাকে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকে তাহলে এবার যে হারে গাছে মুকুল আসতে শুরু করেছে তাতে করে আম বিক্রি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এ অঞ্চলের আমের মধ্যে-ফজলি, খিরশাপাত, গোপাল ভোগ, ল্যাংড়ার ,আড়াজম, আম্রপালি ও আশ্বিনা আমের নাম শোনা যায় সবার মুখে-মুখে। এ ছাড়াও বৌ-ভুলানী, রানীপছন্দ, জামাইখুসি, বৃন্দাবন, লকনা, বোম্বাই খিরসা, মহনভোগ, সেনরি, ব্যানানা, খিরসা পাত , বৃন্দাবনী, ও কালীভোগ-সহ প্রায় দেড়’শ জাতের আম রয়েছে। প্রতিবছর আম মৌসুমে এ উপজেলায় প্রায় লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়।


এ অঞ্চলের আম বাগান মালিকরা জানান, প্রতি বছর মাঘের শুরুতে আম গাছের ডালে ডালে মুকুল ফুটতে শুরু করে। এ দিক থেকে বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা মুকুলের পরিচর্যা শুরু করেছেন। তাঁদের মতে, এবার পরিপূর্ণ মুকুল ফুটে গুটি বের হতে ফল্গুন শেষ হবে। এখানে আঞ্চলিক ভাবে প্রবাদ রয়েছে, ‘আমের আনা মাছের পাই, টিকলে পরে কে কত খাই।’আম চাষীদের মতে, গাছে-গাছে যে পরিমাণ মুকুল আসে, তার সিকিভাগ (২৫%) টিকে গেলেও আমের বাম্পার ফলন হবে। উপজেলার আমোদপুর গ্রামের সফল আম চাষি মহাসিন আলী জানান, গাছে মুকুল আসার পর থেকে আম পাড়া পর্যন্ত ৫ থেকে ৬ বার কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। তাতে হেক্টরে ৩৮ থেকে ৪৫ হাজার টাকার বালাইনাশক লাগে।


বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ্ সুলতান বলেন,বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আম চাষ করলে এর উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি সঠিক ভাবে সংরণ এবং পরিবহন, রপ্তানি-সহ বাজারজাত করলে কৃষকরা ব্যপক হারে লাভবান হবেন। তিনি উন্নত পদ্ধতিতে আম চাষ ও রক্ষনা-বেক্ষনের জন্য কৃষকদের নানা পরামর্শ দেয়ার ফলে গত ৭-৮ বছর থেকে বাঘার আম বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শফিউল্লাহ জানান, এ উপজেলায় সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে।