গণকন্ঠ প্রতিবেদক

হাসান শিকদার, মানিকগঞ্জ

প্রকাশিত: ০৩ মার্চ ২০২৬ , ০২:৫৫ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

#

শ্রেণি-পেশা ভুলে এক কাতারে ইফতার: লাভ ফর ব্লাডের অনন্য আয়োজন

ছবি সংগৃহীত

ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে মানিকগঞ্জ জেলা শহরের সড়ক ও জনপথ বিভাগের কার্যালয়ের সামনে রাস্তার পাশে চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য। দীর্ঘ রিকশার সারি, ক্লান্ত মুখে অপেক্ষমাণ শ্রমজীবী মানুষ, ব্যস্ত পথচারী—সবার গন্তব্য যেন এক জায়গাতে। সেখানে চলছে মানবতার অনন্য আয়োজন।

টানা পাঁচ বছর ধরে রমজানে প্রতিদিন বিনামূল্যে ইফতারের বিতরন করে আসছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন লাভ ফর ব্লাড।

 মানিকগঞ্জ জেলা শহরের ল কলেজের বিপরীতে সড়ক ও জনপথ কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ৩ শতাধিক মানুষ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ইফতার করার সুযোগ পান।


একসাথে ইফতার আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—শ্রেণি ও পেশার ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে বসে সকল মানুষের ইফতার করার সুযোগ । বিসিএস কর্মকর্তা, শিক্ষক, রাজনৈতিক বা সামাজিক নেতারা যেমন এখানে আসেন তেমনি রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর ও সাধারণ পথচারীরাও একই কাতারে বসে ইফতার করেন। মানবিক সমতার এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে বিনামূল্যের এ ইফতার আয়োজন।


লাভ ফর ব্লাডের সভাপতি মুশফিকুর রহমান নিবিড় বলেন, জনবহুল এই সড়কে ইফতারের সময় বহু মানুষ যাতায়াত করেন। অনেকেই সময়মতো বাসায় ফিরতে পারেন না কিংবা স্বস্তিতে ইফতার করার সুযোগ পান না। সেই ভাবনা থেকেই পথচারী ও শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, প্রথমদিকে শুধু শ্রমজীবী ও সুবিধাবঞ্চিতদের ইফতার করানোর ইচ্ছা ছিল। তবে সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা ও ভালোবাসায় আজ তা বৃহৎ পরিসরে রূপ নিয়েছে।


আয়োজকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, স্বেচ্ছাশ্রমে সাজানো ইফতার

প্রতিদিন বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা টেবিল সাজিয়ে প্লেটে প্লেটে ইফতার পরিবেশনের প্রস্তুতি নেন। ৫টা ৩০ মিনিট থেকে শৃঙ্খলার সঙ্গে ইফতারের প্লেট বিতরণ শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া একদল শিক্ষার্থী নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন।

সংগঠনটির সহসভাপতি তৌফিক আহমেদ নির্জন বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “এত সহজে এত মানুষের সেবা করা সম্ভব—ইফতার বিতরণের মাধ্যমে তা উপলব্ধি করতে পারছি।”


নিয়মিত ইফতার তালিকায় থাকে ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, শসা, খেজুর ও শরবত। কখনো খিচুড়ি, কখনো মোরগ পোলাও কিংবা বিরিয়ানিও পরিবেশন করা হয়। সব খাবার সংগঠনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুত করা হয়।


সংগঠনটির সাবেক আহবায়ক সিয়াম খান জানান, আমাদের সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন মানুষদের সহযোগিতায় বহু বছর ধরে এই কার্যক্রম চালু রয়েছে। আশপাশের শ্রমজীবী মানুষ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের রোগী-স্বজনরাও এতে অংশ নেন।


সংগঠকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, খবিরুল রহমান সিয়াম, শাফিনুর রহমান রাদ, অনিক হাসান, হিমেল মিয়া ও স্বাধীন আহমেদের মতো অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন তরুন প্রতিদিন এ স্বেচ্ছাসেবী কাজ বাস্তবায়নে শ্রম দিয়ে থাকে।


৫০ বছর বয়সী রিকশাচালক করিম মিয়া বলেন, সারাদিন রোজা রেখে রিকশা চালানোর পর বাড়িতে গিয়ে ইফতার করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তাই প্রতিদিন এখানে এসে ইফতার করি। আয়োজকদের জন্য তিনি সব সময় মন থেকে দোয়া করেন বলেও জানান।


 বাহারি ইফতার আয়োজনে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার টাকা ব্যয় হয় বলে জানা যায়। রমজানের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত নিরলসভাবে চলে বিনামূল্যের একসাথে ইফতারের কার্যক্রম।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, তরুণদের এমন উদ্যোগ শুধু প্রশংসনীয় নয়, বরং অনুপ্রেরণামূলক। ভালো কাজে তরুণদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো উচিত।


সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের মানবিক আয়োজন দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে রমজানের শিক্ষা বাস্তব জীবনে আরও দৃশ্যমান হবে।